রুস্তম আলী: রংপুর: ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৯ই জুন তারিখে রংপুর জেলা প্রশাসন পরিচালিত রংপুর কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজটির অভ্যন্তরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারীতা নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা পরিচালনা করেন। নিরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বর্তমান অধ্যক্ষ মঞ্জুয়ারা পারভীনকে অবৈধ অধ্যক্ষ ঘোষণা করে, যে নির্দেশনা জারি করেন সেটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ক্রমিক নং-২ এর শিরোনামে উল্লেখ রয়েছে-কলেজ শাখায় শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে এবং মাধ্যমিক ও কলেজ শাখার কয়েকজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করে যুগাধিক ঝুলিয়ে রেখে ঐ পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেন অবৈধভাবে।
মঞ্জুয়ারা পারভীন (ইন: ৪০২১৬২) ০৩/০৬/২০১২ তারিখে অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। মঞ্জুয়ারা পারভীন ১৬/০২/২০১২ তারিখে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করেন। আবেদনে তিনি ০৫/০২/২০১২ দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির উল্লেখ করেন। কিন্তু ০৫/০২/২০১২ তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় অত্র প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ নিয়োগের কোন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে ০৬/০২/২০১২ তারিখে। ফলে তার আবেদনপত্রটি বাতিলযোগ্য ছিল। আবেদনকালে তিনি তারাগঞ্জ ও/এ ডিগ্রি কলেজ, তারাগঞ্জ, রংপুরে প্রভাষক পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি অধ্যক্ষ পদের আবেদনটি উক্ত কলেজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করেননি এবং অভিজ্ঞতা দাবী করলেও তিনি আবেদনের সাথে কোন অভিজ্ঞতার সনদ সংযুক্ত করেননি। এ ক্ষেত্রেও তার আবেদনপত্রটি বাতিলযোগ্য ছিল। তিনি ১৬/০২/২০১২ তারিখে আবেদন করলেও আবেদনের গায়ে ০৪/০৩/২০১২ তারিখে গৃহীত উল্লেখ আছে। এতে তিনি শর্তানুযায়ী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ ০৬/০২/২০১২ হতে ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দপ্তরে আবেদন পৌঁছিয়েছিলেন কিনা তা সন্দেহ যুক্ত। ২৮/০৪/২০১২ তারিখে শুধু ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করা হয়। কোন লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়নি। লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ না করার কোন কারণ জানা যায়নি। নম্বর ফর্ম অনুযায়ী ১২ জন প্রার্থীর মধ্যে মঞ্জুয়ারা পারভীন ১০ নম্বরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪.৩৭ নম্বর পেয়ে প্রথম হন। প্রার্থীদের হাজিরা তালিকা অপ্রদর্শিত। নিয়োগ বোর্ড নম্বর ফর্দে তাকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেন। নিয়োগ বোর্ডের পৃথক রেজুলেশন পরিলক্ষিত হয়নি। জিবি’র ২৪/০৫/২০১২ তারিখের সভায় নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশ অনুমোদন করা হয়। জিবি’র সভার রেজুলেশনে জিবি’র সভাপতির একক স্বাক্ষর রয়েছে। এতে অন্য কোন সদস্যের স্বাক্ষর পরিলক্ষিত হয়নি। ০৩/০৬/২০১২ তারিখ পূর্বাহ্নে অত্র কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। তারাগঞ্জ ৩/এ ডিগ্রি কলেজের ছাড়পত্রটিও ০৩/০৬/২০১২ তারিখে ইস্যুকৃত। এতে তিনি উক্ত ছাড়পত্র গ্রহণ করার পর যোগদান করেছিলেন না, এর পূর্বে যোগদান করেছেন তা নিশ্চিত নয়। উল্লেখিত অনিয়মের কারণে অধ্যক্ষ পদে জনাব মঞ্জুয়ারা পারভীনের নিয়োগ বিধি সম্মত হিসেবে গণ্য নয় এবং এমপিওভুক্তির তারিখ হতে ৩১/০৩/২০১৬ তারিখ পর্যন্ত গৃহীত বেতন ভাতা বাবদ ১৩,৩৩,৮০০/- (তের লক্ষ তেত্রিশ হাজার আটশত) টাকা সরকারি খাতে ফেরতযোগ্য। এর পরে গৃহীত বেতন ভাতাও ফেরতযোগ্য হবে। এতো কিছু অভিযোগ থাকার পরেও অদৃশ্য শক্তির বদৌলতে স্ব-পদে রয়েছে মঞ্জুয়ারা পারভীন।
অবিলম্বে চরম স্বৈরাচারী দুর্নীতিগ্রস্থ অধ্যক্ষ মঞ্জুয়ারা পারভীন এবং তার সকল অনিয়ম স্বেচ্ছাচারী কর্মকান্ডের দোসর শিক্ষক নাহেদ ফরিদ-এর অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করে আন্দোলনকারীরা।
২০১৮’র জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাতের ভোটের রূপকার সে সময়ের সচিব অধ্যক্ষ মঞ্জুয়ারা পারভীনের ভাই ফয়েজ আহমেদ এবং শ্রেষ্ঠ দুর্নীতিবাজ এবং চাটুকার এই অধ্যক্ষের স্বামী সাবেক উপ-সচিব আবুল কালাম আজাদকে দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষের দুর্নীতির সহায়তাকারী হিসেবে তাদের সকল অনিয়মের সহযোগী হিসেবে আছেন। মঞ্জুয়ারা পারভীন বিধি বর্হিভূক্তভাবে একই সাথে দুইটি স্কেলে বেতন গ্রহণ করেন।
২০১৬ খ্রি. জুন মাসে এই অবৈধ অধ্যক্ষের মূল বেতন ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) হাজার টাকা ছিল যা পরের জুলাই মাস যেতে ৬৭ হাজার টাকা ফুল বেতন উত্তোলন করেন। যা আলাদীনের চেরাগের মতো ভাই ও স্বামীর যোগসাজোসে কথা হয়েছে বলে জানা যায়, যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। অধ্যক্ষ হিসেবে বেসরকারি শিক্ষা নীতিমালা অনুসারে ৫ম গ্রেডের মূল বেতন ৬৯,৮৫০ টাকা, কিন্তু এই অবৈধ অধ্যক্ষ বর্তমানে তৃতীয় গ্রেডে মূল বেতন ৬৯,৩৪২ টাকা লুটে নিচ্ছে জেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, তৃতীয় গ্রেডে বেতন উত্তোলন করছেন।
কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের পরিচ্ছন্নতাকর্মী (সুইপার) রিপন ২০১২ খ্রি. চাকরি হতে অব্যাহতি নিয়ে রংপুর জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে চাকরি নেয়। কিন্তু এই অবৈধ অধ্যক্ষ উক্ত সুইপার রিপনের নামে ২০১২-২০১৬ খ্রি. পর্যন্ত ৫২ মাসের বেতন প্রায় ৫ লাখ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করে আত্মসাত করে। সে সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিষয়টি আলোচিত হলেও আ’লীগের দোসর ভাই সচিব ফয়েজ ও স্বামী আবুল কালাম আজাদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। এই অবৈধ অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা অংক লুফে নেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্মিত শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য সরকারি ভাতা নীতিমালায় অধ্যক্ষ নিয়োগের পূর্ব অভিজ্ঞতাকে এই নীতিমালায় সংযুক্ত করেছেন। কিন্তু এই নীতিমালা তৈরী হয়েছে অত্র প্রতিষ্ঠানে যে যতদিন চাকরি করবেন, তার ভিত্তিতে। বিধি মোতাবেক প্রতিষ্ঠানের যে কোন ব্যাংক একাউন্ট অধ্যক্ষ এবং পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির যৌথ স্বাক্ষরে হওয়ার বিধান থাকলেও দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষ তার ব্যক্তিগত নামে ব্যাংক একাউন্ট পরিচালনা করে আসছে। ঐ ব্যাংক একাউন্টে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশংসা পত্র এবং সনদপত্রের টাকা জমা হওয়ার কথা। প্রতি বছর এসএসসি, এইসএসসি এবং জুনিয়র সার্টিফিকেট সনদ থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা আদায় হয়। সেই হিসেবে ২০১২-২০২০ খ্রি. পর্যন্ত ১২ বছরে ২৪ লাখ টাকা জমা হওয়ার কথা, কিন্তু উক্ত তহবিলে ১০ লাখ টাকার অধিক নেই, যা তিনি পকেটস্থ করেছেন। এ ব্যাপারে রংপুরের বৈষম্যবিয়োগী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কবৃন্দের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চেয়েছেন।স্বেচ্ছাচারী অবৈধ অধ্যক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা চরম সীমায় পৌঁছেছে। তিনি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি এবং নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন বেপরোয়াভাবে। দুর্নীতিবাজ এই অধ্যক্ষ মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দিলীপ চন্দ্র রায় নামীয় শিক্ষককে একই সাথে দুটি পদে নিয়োগ দিয়েছেন। একটি পদে এমপিওভুক্ত হয়ে অন্যটি নন এমপিও হিসেবে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। সারা দেশে যখন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন দফা নিয়ে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয়, তখন এই অধ্যক্ষ এই প্রতিষ্ঠান থেকে কোন শিক্ষার্থী বা শিক্ষককে বের হতে দেয়নি। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদেরকে হুমকির মুখে রাখে।এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী আনিছ এক সময় তার বাড়ির গৃহভৃত্য হিসেবে কর্মরত ছিল। সেখান থেকে জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা অধ্যক্ষের স্বামী আবুল কালাম আজাদ এর কার্যালয়ে অনিয়মিতভাবে মৌসুমি ভূমি জরিপ কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। পরবর্তীতে মঞ্জুয়ারা পারভীন কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার স্বামী আবুল কালাম আজাদের শলাপরামর্শে উল্লেখিত আনিছকে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমএলএসএস পদে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নিয়োগ প্রদান করে। উল্লেখিত আনিছকে দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষ এক সময় সব কাজের কাজি বানিয়ে ফেলে, যা দুর্নীতির চরম সীমায় পৌঁছে। উক্ত আনিছ অধ্যক্ষের নির্দেশে শিক্ষকসহ ঐ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের শাসন করার পায়তারা অব্যাহত রাখে। এই অধ্যক্ষ, তার স্বামী আবুল কালাম আজাদ (জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা) এর ক্ষমতা ও দাপটের বদৌলতে দীর্ঘ বছর ধরে বিনা ভাড়ায় নগরীর আরকে রোডে অবস্থিত জেলা পরিষদ এর অতিথি ভবনে (ডাক বাংলো) নিজস্ব বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করে। এমতাবস্থায় বিষয়টি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীর হস্তক্ষেপে সামান্য ভাড়া দেয়া শুরু করে, যা নিয়ম বহির্ভূত।
অধ্যক্ষের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার সকল কর্মকাণ্ডের বিষয়ে রংপুর জেলা প্রশাসন পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের সভাপতি ও জেলা প্রশাসককে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার লিখিতভাবে অভিযোগ জানালেও উল্টো অভিযোগকারীকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উল্লেখিত বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ঘেরাও কর্মসূচি সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে সেনাবাহিনী এসে তা নিয়ন্ত্রণে আনেন।